সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচনায় এসেছে পাকিস্তানের তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান। জেএফ-১৭ থান্ডারকে সাধারণভাবে পাকিস্তান ‘দেশে উৎপাদিত’ হিসেবে প্রচার করলেও খুঁটিনাটি দেখলে এটি মূলত চীন-পাকিস্তানের যৌথ উন্নয়ন ও উৎপাদন প্রকল্প। হালকা ওজনের এক ইঞ্জিনবিশিষ্ট বহুমুখী যুদ্ধবিমানটি যৌথভাবে তৈরি করেছে পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স (পিএসসি) এবং চীনের চেংদু এয়ারক্র্যাফট করপোরেশন (সিএসি)।
আশির দশকের শেষের দিকে পাকিস্তান বিমানবাহিনী তাদের পুরোনো যুদ্ধবিমানগুলো প্রতিস্থাপন করার জন্য নতুন চতুর্থ প্রজন্মের বহুমুখী যুদ্ধবিমানের খোঁজ করছিল। ঠিক সেই সময়ে পাকিস্তানের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয় চীন। এই বন্ধুত্বের শিকড় অনেক গভীরে। চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের একটি বড় মাইলফলক ১৯৬৩ সালের সীমান্ত চুক্তি। এই ধরনের আনুষ্ঠানিক চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ককে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি’ থেকে ‘রাষ্ট্রীয় কাঠামোয়’ নিয়ে যায়। যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে নিরাপত্তা সহযোগিতায়।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের এক ওয়ার্কিং পেপারে বলা হয়, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদকে সামরিক সরবরাহ বন্ধ করলে সেই ঘাটতি চীন জরুরি সরবরাহ দিয়ে কাটাতে সহায়তা করে। আর ১৯৭১ সালে হেনরি কিসিঞ্জারের গোপন চীন সফর আয়োজনেও পাকিস্তান ‘সেতু’ হিসেবে ভূমিকা রাখে, যা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কোন্নয়নের ইতিহাসে বহুল আলোচিত।
এই ছোটখাটো সহযোগিতাগুলো কেবল কূটনৈতিক সাফল্য ছিল না। এগুলোই পরে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও যৌথ প্রকল্পে আস্থার কাঠামো তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউয়ে দেওয়া সাবেক সিনেটর লিসা কার্টিসের ২০০৯ সালের সাক্ষ্যে বলা হয়, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে চীন পাকিস্তানে অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহ এবং পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে ‘বৈজ্ঞানিক দক্ষতা’ সহায়তা দেয়। বিশেষ করে ১৯৯২ সালে চীন পাকিস্তানকে ৩৪টি স্বল্পপাল্লার এম-১১ ব্যালিস্টিক মিসাইল সরবরাহ করে, যা দুই দেশের সামরিক সহযোগিতার ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ উন্নয়নগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত।
একই সাক্ষ্যে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের অতীতে পাকিস্তানের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও চীন পাকিস্তানের সামরিক আধুনিকীকরণে ধারাবাহিকভাবে সহায়তা করেছে এবং সাম্প্রতিক (সেই সময়কার) প্রচলিত অস্ত্র বিক্রির তালিকায় জেএফ-১৭ বিমান ও উৎপাদন অবকাঠামোসহ নানা প্ল্যাটফর্মের উল্লেখ আছে। এই ‘স্থায়ী নিরাপত্তা ছাতা’, পাকিস্তানের দুর্বল অর্থনীতি সত্ত্বেও প্রতিরক্ষা শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও টেকসই প্রকল্প (যেমন জেএফ-১৭) ধরে রাখার কৌশলগত শর্ত তৈরি করেছে।
মন্তব্য করুন