রামুতে পৌরসভা ও উপজেলার পূর্বাঞ্চলে নতুন উপজেলা গঠনের দাবি।
কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলা ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ একটি জনপদ। এর ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন ও গৌরবময়। আরাকান রাজবংশ, রামায়ণের কিংবদন্তি এবং প্রাচীন আরব ও গ্রিক পর্যটকদের বর্ণনায় রামুর উল্লেখ পাওয়া যায়। আরাকানকেন্দ্রিক যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল রামু।
এক বর্ণনা মতে, খ্রিস্টপূর্ব ৩০৮ অব্দে এ অঞ্চলে মানবসভ্যতার বিকাশ ঘটে। অন্য বর্ণনায় গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমির ১৫০ খ্রিস্টাব্দের মানচিত্র এবং পর্তুগিজ ঐতিহাসিক ম্যানরিকের গ্রন্থে রামুর প্রাচীন অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। পর্তুগিজ ও আরব বণিকরা চট্টগ্রামে ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এসে নিরাপদ অবস্থান ও সহজ যাতায়াতের সুবিধার জন্য এ অঞ্চলকে নিজেদের দুর্গ হিসেবে ব্যবহার করতেন।
পরবর্তীতে মোগলরা আরাকানিদের দুর্গ দখল করে আরাকান রাজ্য, চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। মায়ানমার ও আরাকানিদের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে রামু অঞ্চলে আশ্রয় নেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭৯৮ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স এ অঞ্চলে এসে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে এ অঞ্চল দীর্ঘদিন প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে প্রশাসনিক সংস্কার করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯০৮ সালে রামুকে থানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ১৯৮৩ সালে থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়।
এত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও রামুর মানুষ যুগের পর যুগ অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার। রামুকে পৌরসভায় উন্নীত করা এখন সময়ের দাবি।
রামুর পূর্বাঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে কক্সবাজার জেলার অন্যতম বৃহৎ নদী বাঁকখালী। এই নদীকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের জনবসতি, কৃষি, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে রামুর পূর্বাঞ্চলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হাবে পরিণত করা সম্ভব।
রামুর পূর্বাঞ্চলের দক্ষিণে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়ন এবং উত্তর-পূর্বে দোছড়ি ইউনিয়ন অবস্থিত। বিশাল পাহাড়ি অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অসংখ্য রাবার বাগান। পাশাপাশি উন্নতমানের কাঠ, বাঁশ, কুল, বরইসহ বিভিন্ন ফলের চাষ, কৃষিকাজ ও পশুপালনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এসব পণ্য বাঁকখালী নদী ও সড়কপথে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।
বাইশারী ও দোছড়ি ইউনিয়নের মানুষের কক্সবাজারে যাতায়াতের প্রধান পথ গর্জনীয়া, কচ্ছপিয়া ও কাউয়ারখোপ হয়ে। কিন্তু সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামোর অভাবে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ট্যাক্স আদায় করা হলেও তার বড় অংশ সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
বাঁকখালী নদীর অববাহিকায় জেগে ওঠা চরাঞ্চলে সারা বছর ধান, শাকসবজি, ফলমূলসহ নানা কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। বর্তমানে তামাকসহ বিভিন্ন অর্থকরী ফসলেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে রামুর পূর্বাঞ্চল। কক্সবাজার জেলার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সবজি ও কৃষিপণ্য এখান থেকেই সরবরাহ হয়। অথচ এ অঞ্চলের মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও নাগরিক সুবিধা থেকে এখনও অনেকটাই বঞ্চিত।
রামুর পূর্বাঞ্চলের গর্জনীয়া, কচ্ছপিয়া, ঈদগড় ও কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের প্রায় ৫–৬ লক্ষ মানুষ উন্নয়নের মূলধারা থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এখনও যাতায়াতের প্রধান ভরসা সিএনজি অটোরিকশা। বিকল্প গণপরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
উচ্চশিক্ষার জন্য অনেক শিক্ষার্থীকে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ওপর নির্ভর করতে হয়। সীমান্তবর্তী ও পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় চোরাচালান, ডাকাতি এবং সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। গর্জনীয়ায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি থাকলেও জনবল সংকট ও দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থার কারণে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ক্রমেই রামুর পূর্বাঞ্চলে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের নিরাপদ জীবনযাত্রার জন্য উদ্বেগজনক।
১৯৭২ সালে প্রশাসনিক সুবিধার্থে বৃহত্তর গর্জনীয়া ইউনিয়নকে গর্জনীয়া, ঈদগড় ও কচ্ছপিয়া—এই তিনটি ইউনিয়নে বিভক্ত করা হয়। বর্তমান বাস্তবতায় সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, নাগরিক সেবা নিশ্চিত, প্রশাসনিক কার্যক্রম সহজীকরণ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে রামুর পূর্বাঞ্চল নিয়ে একটি নতুন উপজেলা গঠন সময়ের দাবি।
প্রশাসনিক প্রয়োজনে বৃহত্তর জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের কিছু অংশ, গর্জনীয়া ইউনিয়নের পশ্চিমাংশ এবং ঈদগড় ইউনিয়নের কিছু অংশ নিয়ে ঐতিহাসিক নন্দাখালীকে কেন্দ্র করে একটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে গর্জনীয়া, ঈদগড়, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ এবং জোয়ারিয়ানালার পূর্বাংশ নিয়ে একটি নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
নতুন উপজেলার নাম গর্জনীয়া উপজেলা রাখা যেতে পারে। বিকল্পভাবে, এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বাঁকখালী নদীর নাম অনুসারেও উপজেলার নামকরণ করা যেতে পারে।
রামুর পূর্বাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের নাগরিক বঞ্চনা দূর করতে এবং সীমান্ত অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
মুর্শেদুল ইসলাম কাউসার
সমাজকর্মী ও সংগঠক
#মুর্শেদুল_ইসলাম_কাউসার
#জনতা৭১ #রামু #কক্সবাজার
মন্তব্য করুন